জুম চাষ কি? জুম চাষ কিভাবে করা হয়? ব্যাখ্যা কর?

জুম চাষ কি: পাহাড়ের জঙ্গল কেটে শুকিয়ে অতঃপর পুড়িয়ে পরিষ্কার করে ধান সহ অন্যান্য ফসল চাষ করার পদ্ধতি হচ্ছে জুম চাষ। অথবা সংক্ষিপ্তভাবে বলা যায়, পাহাড়ি এলাকায় প্রচলিত এক ধরনের কৃষি চাষ পদ্ধতির নাম হচ্ছে জুম চাষ।

অনেক জায়গায় কিংবা অনেক এলাকায় জুম চাষকে ঝুম চাষ বলা হয়। জুম চাষ এক প্রকার স্থানান্তরিত কৃষি পদ্ধতি।

পাহাড়ের জঙ্গল পুড়িয়ে দিয়ে কিংবা কেটে ফাঁকা করে ঐ জায়গায় এই জুম চাষ করা হয়।

আবার যখন ঐ জায়গার জমির উর্বরতা কমে যায় কিংবা  ফসল উৎপাদন  কম হয় তখন ঐ জায়গা থেকে স্থানান্তরিত হয় আবার অন্য জায়গায় কৃষি জমি তৈরি করা হয়। আর এর জন্য পাহাড়ের গায়ের ঢালু এলাকা নির্বাচন করা হয়। কেননা পাহাড়ের গায়ের ঢালু এলাকাতে জুম চাষ করা সম্ভব।

জুম চাষ কি
জুম চাষ কি?

জুম চাষ পদ্ধতি ব্যবহার করার মাধ্যমে বছরের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ঋতুতে বিভিন্ন রকমের ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হয়।

আর এই জুম চাষ পদ্ধতির কারণে পাহাড়ের মতো নির্গম ও কঠিন অঞ্চলেও ফসলের উৎপাদন করা সম্ভব।

জুম চাষ পদ্ধতি ব্যবহার করে চাষ করার মাধ্যমে পাহাড়ি অঞ্চলের ক্ষুদ্র নিগোষ্ঠীরা তাদের জীবন অতিবাহিত করে থাকে। জুম চাষ পদ্ধতি ছাড়া অন্য কোন পদ্ধতিতে পাহাড়ি অঞ্চলে চাষাবাদ করা খুবই কঠিন এবং কষ্টসাধ্য।

এই পদ্ধতি ব্যবহার করার মাধ্যমে পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র নিগোষ্ঠীরা বছরের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ফসল আবাদ করে থাকে।

এই ফসলের মাধ্যমে খাদ্যের চাহিদা এবং জীবিকা নির্বাহ হয়, হিসাব অনুযায়ী প্রতিবছর 20000 হেক্টর জমি এই পদ্ধতিতে চাষ করা হয়।

জুম চাষ পদ্ধতি খুবই কার্যকরী এবং খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই পদ্ধতি শুধুমাত্র পার্বত্য অঞ্চলের ব্যবহার করা হয় সমতল অঞ্চলে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় না। আমরা তো জানি যে সমতল অঞ্চলে খুব সহজেই যে কোন পদ্ধতিতে যেকোনো ধরনের ফসল চাষ করা সম্ভব।

জুম চাষ কিভাবে করা হয়

এই জুম চাষে একটি সুষ্ঠু এবং উর্বর পাহাড়ের ঢাল নির্বাচন করা হয়, নির্বাচনের সময় লক্ষ্য রাখা হয় পাহাড়টি উর্বর কিনা।

কেননা জমি যদি উর্বর না হয় তাহলে জমির মধ্যে ফসল জন্মাবে কিভাবে। 

তাই জুম চাষ করার জন্য উর্বর জমি নির্বাচন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং খুবই জরুরী। একবার জমি নির্বাচন করা হয়ে গেলে সেই জমিনের মধ্যে থাকা আগাছা সমূহ অর্থাৎ জঙ্গল ও লতা পাতা সমূহ কে কেটে ফেলে রাখা হয়। আর কিছুদিন পরে এই জঙ্গল লতা পাতা সমূহ শুকিয়ে যায়।

শুকিয়ে যাওয়ার পরে সেই শুকিয়ে যাওয়া জঙ্গল লতা পাতা সমুহাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

আগুন ধরিয়ে দেওয়ার সময় এ বিষয়টি ভালোভাবে লক্ষ্য রাখা হয় যেন এক পাহাড়ের আগুন অন্য জমিতে গিয়ে না ছড়ায়।

কয়েকদিন পরে এই জমি কে আবার পুনরায় পরিষ্কার করা হয়। এরপর দুই এক বার বৃষ্টি হওয়ার কারণে জমি আরো উর্বর হয়ে যায়।  বৃষ্টি হওয়ার কারণে জমি ভিজে নরমও হয়। এরপর সেই সময় বীজ বোনার জন্য উপযুক্ত হয়ে যায় এবং এর কিছুদিন পরে বীজ বোনা হয়।

চৈত্র সংক্রান্তি এবং নববর্ষ উৎসবের পরে এ অঞ্চলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীরা তাদের পরিবারের সকলে মিলে ফসলের বীজ বোনার উৎসবে মেতে উঠে।

দা নামক একটি ধারালো অস্ত্র দিয়ে বাম হাতের সাহায্যে মাটিকে ফাঁকা করা হয়। 

এরপর ফাঁকা হয়ে যাওয়ার মাটিতে ডান হাত দিয়ে বিভিন্ন রকম ফসলের বীজ বপন করা হয়।

এখানে একত্রে মেশানো ধান, ভুট্টা, বার্লি  অন্যান্য অনেক বীজ একসাথে বপন করা হয় এবং একসাথে চাষাবাদ করা হয়।

এই চাষাবাদ করার জন্য ফসলের মধ্যে কোন প্রকার কীটনাশকের ব্যবহার করা হয় না।

চাষ করার কারণে জমির উর্বরতা কমে গেলে। ঐ জমিকে কয়েক বছরের জন্য এমনিতে খালি রেখে দেওয়া হয়।

যাতে করে সেই জমির উর্বরতা বৃদ্ধি পায়। আর এর পরিবর্তে অন্য জমি প্রস্তুত করে সেখানে চাষাবাদ করা হয়।

শেষ কথা:

জুম চাষ হয় একমুখী কৃষি পদ্ধতি, এই পদ্ধতি ব্যবহার করে পাহাড়ের ঢালে একটি সময় বিভিন্ন ফসল একসাথে চাষাবাদ করা হয়।

আর এই ফসলসমূহ চাষাবাদ করার জন্য জুম চাষিরা খুব কঠোর পরিশ্রম করে থাকে।

যারা জুম চাষ করে কিংবা জুম চাষিরা অনেক গরীব হয়ে থাকে। এই জুম চাষিরা পাহাড়ের ঢাল নির্বাচন করার পর সেই পাহাড়ের ঢালকে অনেক কষ্ট করে পরিষ্কার করে তারপর আগুন জ্বালিয়ে ফের আবার পরিষ্কার করে। আর অনেক কষ্ট করে ফসল উৎপাদন করে।

জুম চাষীদের এই হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের কারণে পাহাড়ের ঢালের মতো দুর্গম স্থানে চাষাবাদ করা সম্ভবপর হয়েছে।

তারা যদি এরকম হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে চাষাবাদ না করত তাহলে ওই সকল পাহাড়ের ঢালে চাষাবাদ করা সম্ভব হতো না। 

কিন্তু এই জুম চাষ করার ক্ষেত্রে কিছু অসুবিধা রয়েছে এবং কিছু ক্ষতিও রয়েছে আমাদের। তারমধ্যে সবচেয়ে বড় ক্ষতি তাহলে পাহাড়ের ঢাল অনেক সময় ধ্বসে পড়ে কিংবা ক্ষয় হয়ে যায়। পাহাড়ের ঢাল ধসে পড়ার কারণে পাহাড়ের কিংবা আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতি হয়। 

আর এই ক্ষতি আমাদের জীবন যাত্রার জন্য আমাদের জীবন মাণের জন্য হুমকি স্বরূপ। কিন্তু এই পদ্ধতি অনুসরণ করার মাধ্যমে পাহাড়ি অঞ্চলের ক্ষুদ্র নিগোষ্ঠীদের খাদ্য চাহিদা মিটে। এই পদ্ধতি তাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাদের জীবিকা নির্বাহের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 

আশা করি যে আপনি আমাদের এই পোস্টটি পড়ার মাধ্যমে জুম চাষ কি এই সম্পর্কে সম্পূর্ণ জ্ঞান অর্জন করতে পেরেছেন।

আর এই বিষয়ে আপনার যদি অন্য কোন মতামত কিংবা প্রশ্ন থেকে থাকে তাহলে আপনি আমাদেরকে কমেন্ট করতে পারেন।

আরও পড়ুন: সমন্বিত চাষ কাকে বলে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *